হার না মানা কাগজ বুড়ির গল্প

পূর্ব মেদিনীপুর: জীবন যাপনের লড়াই-এর এক অন্য গল্প। দীর্ঘ ৩৭ টা বছর ধরে অভাবের সঙ্গে লড়ে আসছেন এক বৃদ্ধা। রাস্তায় নেমে কাগজ বিক্রি করে চলছে এই লড়াই। এই কঠিন লড়াই প্রায় চার দশক আগে শুরু করেছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি ১নম্বর ব্লকের প্রান্তিক এলাকার বাসিন্দা ৮১ বছর বয়সের বাসন্তী ত্রিপাঠী।

বেঁচে থাকার তাগিদেই ঘর ছেড়ে বাসন্তী দেবী বেড়িয়ে পড়েন খবরের কাগজ বিক্রি করতে। সেই সময় বাড়ির মহিলাকে কাগজ হাতে হকারী করতে বাধা দিয়েছিলেন প্রায় সকলেই। পাড়ার প্রতিবেশীরাও তাঁর এই কাজকে সমর্থন করেনি। প্রচুর অপমান আর কটুক্তি সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু সেসব কিছুকে ছাপিয়ে সব বাধা উপেক্ষা করে লড়াই করে গিয়েছেন। এভাবেই কেটে গিয়েছে ৩৭ টা বছর। আজ ৮১ বছর বয়সেও সেই লড়াই চলছে। নাম হয়েছে কাগজ বুড়ি।

বার্ধক্য ও শারিরীক অসুস্থতা সত্বেও দিনের পর দিন খবর বেচেই চলছেন তিনি। পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরী ২ব্লকের প্রান্তিক এলাকায় গেলেই দেখা পাওয়া যায় সেই কাগজ বুড়ির। আবার অনেকেই সম্মান দিয়ে তাঁকে কাগজ মাসি বলেও ডাকে। লড়াইটা কঠিন।

কাগজ বুড়ির এই কাজ টা একেবারেই সহজ ছিল না। প্রথমে স্থানীয় পত্রিকা বিক্রি করা দিয়েই শুরু করেছিলেন কাজ। আসতে আসতে চাহিদা বাড়তে থাকে এবং পাঠক সংখ্যাও বেড়ে যায়। শুধু স্থানীয় পত্রিকা নয়, কলকাতা থেকে প্রকাশিত কাগজের গ্রাহকও বাড়ে। শুধু তাই নয়, অফিস থেকে থানা ও স্থানীয় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও এখন নিজের হাতে কাগজ দিয়ে আসেন কাগজ বুড়ি।

সকাল ৬টায় কাগজ সংগ্রহ করে কলাগেছিয়া বাসস্ট্যান্ডে কিছু সময় কাগজ বিক্রির পর রওনা দেন খেজুরীর দিকে। খেজুরীর কুঞ্জপুর, জনকা, বিদ্যাপীঠ বাজারে কাগজ বিক্রি করে ফিরেন রাতের হেরিয়া গামী শেষ বাস ধরে। কোনও দিন বাস ফেল হলে স্থানীয় পথ চলতি সাইকেল, মোটর সাইকেল করে ফেরেন। কাগজ বিক্রির টাকা পেতেন দুপুরে। তার কিছু অংশ দিয়ে চিঁড়ে, মুড়ি কিনে দুপুরের খান।

পরিবারের একমাত্র রোজগেরে কাগজ বুড়ি তথা বাসন্তী দেবী। ছেলে কালীশংকর ত্রিপাঠী ব্যবসায় কাগজ বিক্রির কাজে হাত লাগালেও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। বৌমা ও ২ নাতিনাতনি নিয়ে ৮১ বছর বয়সেও তিনি সংসার চালাচ্ছেন।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত গ্রাহক হিমাংশু শেখর মণ্ডল বলেন, একজন নারী জীবন যুদ্ধে লড়াই করে যে বাঁচতে পারে, তারই প্রমাণ আমাদের কাগজ বুড়ি। সবাই বলেন, খেজুরীর দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তিক এলাকার মানুষজনের সঙ্গে খবরের কাগজের সংযোগ ঘটিয়েছিলেন এই কাগজ বুড়িই। খেজুরী আদর্শ বালিকা বিদ্যাপীঠ এর প্রধান শিক্ষিকা কল্যাণী বর্মন বলেন, কাগজ বুড়ি আমাদের অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত। হতাশায় অনেকে নিজের জীবনকে শেষ করে ফেলার কথা ভাবেন, কাগজ মাসিমাকে দেখে তাদের হতাশা দূর হবে ও জীবন যুদ্ধে লড়াইএর অনুপ্রেরণা যোগাবে।

একা না, অন্যকেও জানান। শেয়ার করুন -

প্রতি মুহূর্তে থাকবেন আপডেট। লাইক করুন Facebook পেজ